যে মাস্টারপ্ল্যানে সিঙ্গাপুর আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে

Singapore Image

৬০ বছর আগেও যে দেশটায় কিছু গরীব জেলে বসবাস করত, দিনে এনে দিনে খাওয়া ছিলো নিত্যদিনের পেশা। মাছ শিকার থেকে খালি হাতে ফিরে আসলে পুরো একটি পরিবার অনাহারে দিন কাটাতো, তাদের দেশেই আজ সুউচ্চ অট্টালিকা। বহুতল ভবনগুলো দেখলে মনে হতেই পারে নিজেকে একটা চিমটি কেটে দেখতে।

বলছি সিঙ্গাপুরের কথা। একটা সময় যেখানে দরিদ্র ও বেকার লোকদের জন্য অভাবের শহর হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলো তারাই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ। এশিয়ার বুকে এক টুকরো ইউরোপ বলাটাই স্বাভাবিক। আধুনিকতা ও প্রযুক্তিময় পরিকল্পনার মিশেলে তৈরি এ দেশ এখন বিশ্বের সব উন্নয়নশীল দেশের রোল মডেল।

সিঙ্গাপুর একটা সময় দরিদ্র লোকদের আবাসস্থল নামে পরিচিত থাকলেও সে দেশটিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর অন্যতম। পুরো বিশ্ব যেখানে ২০২০ সালে বসবাস করছে সেখানে প্রযুক্তির দিক থেকে সিঙ্গাপুর বাস করছে ২০৫০ সালে। আয়তনে প্রায় ঢাকার সমান একটা দেশকে পরিকল্পনামাফিক সাজিয়ে তোলাটা যেকোনো দেশের সরকারের জন্যই চ্যালেঞ্জ, আবার এই জায়গাটাতেই সিঙ্গাপুর সরকার কাজ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আয়তনে মাত্র ৭২২ বর্গকিলোমিটার জায়গার এই দেশটায় কোন স্থাপনা তৈরি করা হবে তা ভাবার আগে সরকারকে চিন্তা করতে হয় কোথায় বানানো হবে। কারণ এই ছোট্ট দেশটার প্রায় প্রত্যেক ইঞ্চি জায়গা ব্যবহার করে ফেলেছে তাদের ৫৭ লক্ষ নাগরিক। বিনোদন ও ব্যবসায়ের জন্য স্থলভাগের প্রায় সকল জায়গাই ব্যবহার করে ফেলেছে তারা।


তবুও নতুন স্থাপনা তৈরির জন্য মাস্টারপ্ল্যান বের করেছে সিঙ্গাপুর সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা। প্রকল্পের নাম দিয়েছে “ভূমি পুনরুদ্ধারকরণ”।

কি? ভড়কে গেলেন? বুঝিয়ে বলি এটার মানে আসলে যেখানে মাটি নেই সেখান থেকে জমি তৈরি করা। ভাবছেন কিভাবে এটা সম্ভব? সিঙ্গাপুরের চারদিকেই সাগর, যার আইনগত জটিলতা না থাকায় সে সাগরের অপ্রয়োজনীয় অংশকে অন্য স্থান থেকে মাটি এনে ভরাট করে স্থল সৃষ্টি করাই এই ভূমি পূনরুদ্ধকরণ প্রজেক্ট। দেশটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলো মূলত এই কৃত্রিম জমির ওপরই স্থাপিত।

সিঙ্গাপুরে যেহেতু জায়গার অভাব প্রকট, তাই তারা এক ইঞ্চি মাটি অপচয় করে না, বরং মাটির নিচের জায়গাটাও ব্যবহার করছে হিসাব করে। সিঙ্গাপুরে রাস্তাঘাট মাটির উপরে যতটুকু আছে তার দ্বিগুণ আছে মাটির নিচে।
এমনকি সিঙ্গাপুরের অনেক দালানের মাটির উপরের অংশের চেয়ে মাটির নিচে কয়েকগুণ বেশি কমার্শিয়াল স্পেস থাকে যেনো জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়।
মজার কথা হলো সিঙ্গাপুরে যে পরিমান মানুষের বসবাস তার জন্য এত আন্ডারগ্রাউন্ড স্থাপনা তৈরির কোনো প্রয়োজনই ছিলোনা। কিন্তু তাদের দেশের সরকার ভেবেছে আগামী ৬০ বছর পরের কথা তখন দেশের জনসংখ্যা বাড়বে দ্বিগুণ, তখন?
কি বুঝলেন?

সিঙ্গাপুরের জন্য আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা, মানুষের মৌলিক চাহিদায় খাবারের অবস্থান সবার আগে কিন্তু সিঙ্গাপুরের ৫৭ লাখ মানুষের খাদ্য যোগান দেওয়ার মতো কৃষিজমিতো নেই। এখন সিঙ্গাপুরের চাহিদার শতকরা ৯৩ শতাংশ খাবারই বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু নিজেদের খাবারের উৎপাদন ব্যবস্থা কিভাবে চালু করা যায় সেটা নিয়েও কাজ করছে সিঙ্গাপুর। “কমার্শিয়াল ভার্টিকাল ফার্ম” নামে একটি এগ্রিকালচার প্রজেক্ট শুরু করেছে তারা।

এ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হলে মাটি বা সূর্যের আলো ছাড়াই যেকোনো ফসল সারা বছর ফলবে সিঙ্গাপুরে। পরীক্ষামূলকভাবে বেশ ক’বার সফলও হয়েছে বিজ্ঞানীদের একটি দল। তবে এখন নতুনভাবে পর্যালোচনা চলছে কৃষিকাজে কিভাবে একাধিক লেয়ারে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা যায়। মানুষ যেমন জায়গার ঘাটতি হ্রাস করতে একটি স্থানে একের বেশি ফ্লোর তৈরি করে বসবাস করে সেভাবে কৃষি পণ্য উৎপাদনেও সেই প্রক্রিয়া অব্যহত রাখার আশা প্রকাশ করছে দেশটি। মূলত বদ্ধ স্থানে সীমিত জায়গায় সর্বোচ্চ ফসল ফলিয়ে খাদ্য ঘাটতি হ্রাস করার জন্য আলাদা বৈজ্ঞানিক টিম তৈরি করেছে তারা।

আর একটা জিনিস সিঙ্গাপুর করেছে, তা হলো ছোট্ট এই দেশটাকে দূষণমুক্ত রাখা। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেয়া যাক পেট্রোল বা ডিজেলচালিত গাড়ি সে দেশে চলেনা অনেক বছর ধরে এমনকি গতাস চালিত গাড়িও বন্ধ হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। কারণ গ্যাস উৎপাদনে পরিবেশ দূষিত হতে পারে। এসবের বিপরীতে ইলেক্ট্রিক কার রাস্তায় নামিয়েছে তারা। ফুল চার্জে একটা ইলেক্ট্রনিক কার ঘন্টায় ২০০ কিমি গতিতে চলতে পারে। মাত্র ১৫ মিনিট চার্জ দিলে ১ ঘন্টা রাস্তায় চলতে পারে এই গাড়ি। ভবিষ্যতে সিঙ্গাপুরের গায়ে যাতে দূষণের দাগ না লাগে সে ব্যাপারে তারা দারুণ সিচেতন।

গরিব ও আকারে ছোট বলে যে দেডটাকে একসময় প্রতিবেশি দেশিগুলো অবজ্ঞা করত তারাই এখন এ দেশটাকে রোল মডেল মনে করে।
বেকার মানুষে সিঙ্গাপুর ভর্তি ছিলো তাদের মাথা পিছু আয় বছরে প্রায় ১ লাখ ডলার।আর এসব কিছুর মূলে আছে সে দেশের মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও সরকারের নেয়া কিছু দারুণ উদ্যোগ। এভাবেই তো পুরো বিশ্বের চেয়ে পাঁচ দশক এগিয়ে গেছে তারা।