ওমরা করার নিয়ম ও দোয়া: সম্পূর্ণ গাইড

ওমরা করার নিয়ম ও দোয়া
ওমরা করার নিয়ম ও দোয়া

ওমরা করার নিয়ম ও দোয়া শুধু হজ্বের ছোট ভাই নয়—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ন্যাসী ইবাদত, যা মসজিদে হারামের আশেপাশে অবস্থিত মক্কায় পালন করা হয়। যেখানে হজ্ব ফরজ, ওমরা সুন্নত ও মোক্তাদ। এই ইবাদতের মাধ্যমে মুমিন আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা লাভ করেন এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাত অনুসরণ করেন। ওমরা করতে হলে কীভাবে শুরু করবেন, কী কী নিয়ম মেনে চলতে হবে, কোন দোয়া পাঠ করতে হবে—এসব বিষয়ে এই নিবন্ধটি আপনার জন্য সম্পূর্ণ গাইড হিসেবে কাজ করবে।

ওমরা কী? এর শারিয়াহি হুকুম ও ফজিলত

ওমরা হলো মসজিদে হারামের আশেপাশে চার বার তাওয়াফ, সাঈ, তাকবীর ও হাদয়ে তাসবিহের মাধ্যমে পূর্ণ করা একটি ইবাদত। এটি হজ্বের মতো সম্পূর্ণ নতুন ইবাদত নয়, কিন্তু তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি ওমরা আদায় করবে, তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।” (বুখারী)। ইমাম নওবিখতি (রহ.) বলেছেন, ওমরা হজ্বের ছোট ভাই হিসেবে গণ্য হয়, যা সন্ন্যাসী ইবাদত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

শারিয়াতে ওমরা সুন্নতে মোক্তাদ, অর্থাৎ এটি ফরজ নয়, কিন্তু এটি আমলের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চমর্যাদাযুক্ত। যেখানে হজ্ব ফরজ, সেখানে ওমরা সুন্নত। তবে যদি কেউ হজ্ব ফরজ করে তারপর ওমরা না করে, তবে তার হজ্ব পূর্ণ হবে না। কিন্তু শুধু ওমরা করলে হজ্বের প্রয়োজন হয় না।

ওমরা করার শর্ত ও নিয়ম

ওমরা করতে হলে কয়েকটি শর্ত মেনে চলতে হবে। এগুলো হলো:

  • ইসলাম গ্রহণ: ওমরা করতে হলে ইসলাম গ্রহণ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কাফের ব্যক্তি ওমরা করতে পারে না।
  • বালিগ় হওয়া: ছেলে ও মেয়ে—উভয়ের জন্য বালিগ় হওয়া প্রয়োজন।
  • আকল থাকা: ওমরা করতে হলে অবশ্যই সামান্য আকল (বুদ্ধি ও স্মৃতি) থাকতে হবে।
  • মক্কায় অবস্থান: ওমরা শুধু মক্কায়, মসজিদে হারামের আশেপাশে করা যায়। অন্য কোথাও করা জায়েজ নয়।
  • ইহরাম বাঁধা: ওমরা করতে হলে মিক্বাত থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে।

ইহরাম বাঁধার নিয়ম

ওমরা করতে হলে মিক্বাতে ইহরাম বাঁধতে হয়। মিক্বাত হলো মক্কা থেকে দূরে অবস্থিত চারটি স্থান—সুফলা, যুলহুলা, কুনফুয়া ও যাত্রিয়া। যে ব্যক্তি এই স্থানগুলো থেকে আসবে, সে ইহরাম বাঁধবে। মক্কার বাসিন্দা মক্কা থেকেই ইহরাম বাঁধবে।

ইহরাম বাঁধার সময় গোসল করা, মাইসর পরা (ছেলেদের জন্য), রুকন ও মাসহ করা ও নিয়ত করা প্রয়োজন। নিয়ত হবে: “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, ওমরাতান ফাতাম্মাহা।”

ওমরা করার ধাপগুলো: কীভাবে করবেন?

ওমরা করার প্রক্রিয়া খুব সহজ ও স্পষ্ট। নিম্নে ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হলো:

১. ইহরাম বাঁধা

মিক্বাতে ইহরাম বাঁধুন। ইহরাম বাঁধার সময় গোসল করুন, নাওয়াবিল মাখসুদ পরুন, মাসহ করুন এবং নিয়ত করুন। নিয়ত হবে: “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, ওমরাতান ফাতাম্মাহা।”

২. তাওয়াফ

মসজিদে হারামে প্রবেশ করুন এবং কা‘বা ঘিরে সাত চক্কর তাওয়াফ করুন। প্রতিটি চক্করে বা-ইয়াম আল-হাজার থেকে হাজারে আস-সাওয়ার পর্যন্ত দোয়া পাঠ করুন। তাওয়াফের সময় দোয়া পাঠ করুন: “সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”

৩. সাঈ

তাওয়াফ শেষ করে সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাত চক্কর চলাফেরা করুন। প্রথম তিন চক্কর দ্রুত, শেষ চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে করুন। সাঈর সময় দোয়া পাঠ করুন: “সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”

ওমরা করার নিয়ম ও দোয়া

৪. হাদয়ে তাসবিহ

সাঈ শেষ করে মসজিদে হুনাইনে দাঁড়িয়ে তিন রাক‘আত নফল নামাজ পড়ুন। এটি সুন্নত, কিন্তু খুব সম্ভব করা উচিত। নামাজের পর দোয়া ইস্তিখারা পাঠ করুন।

৫. হালাক

ওমরা শেষ করার জন্য মাথা মুণ্ডন (হালাক) করতে হবে। ছেলেদের জন্য মাথা মুণ্ডন ফরজ, মেয়েদের জন্য মাথার চুল খুলে মাসহ করা যথেষ্ট। হালাকের পর ওমরা পূর্ণ হয়।

ওমরা করার দোয়া

ওমরা করার সময় বিভিন্ন দোয়া পাঠ করা হয়। এগুলো সুন্নত ও মর্মে গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া দেওয়া হলো:

  • ইহরাম বাঁধার দোয়া: “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, ওমরাতান ফাতাম্মাহা।”
  • তাওয়াফের দোয়া: “সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”
  • হাজরে আসওয়াদ ছুঁয়ে দোয়া: “বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘উযু বিকা মিনাশ শাইতানির রাজীম।”
  • সাঈর দোয়া: “সুবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”
  • নামাজের পর দোয়া ইস্তিখারা: “আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইলমান নাফে‘াঁ, ওয়া রিয়াক্বান গাইরি মারযূয্যাঁ, ওয়া ‘আফিয়্যাতান মিন কুল্লি ইস্মি।”

ওমরা করার সময় মেনে চলতে হবে এমন কয়েকটি নিয়ম

  • ওমরা করার সময় কোনো অশ্লীল কথা-বার্তা বলা যাবে না।
  • মেয়েদের জন্য পর্দা ও শরীর ঢাকা অবশ্যই প্রয়োজন।
  • ছেলেদের জন্য ইহরামের সময় নাওয়াবিল মাখসুদ পরা উচিত।
  • তাওয়াফ ও সাঈ করার সময় অন্যদের পথ বাধা দেওয়া যাবে না।
  • ওমরা করার সময় কোনো অপবিত্র কাজ করা যাবে না, যেমন—চুল কাটা, নখ কাটা, গাছ কাটা ইত্যাদি।

ওমরা করার ফজিলত ও গুনাহ ক্ষমা

ওমরা করার ফজিলত অপার। হাদিসে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি ওমরা আদায় করবে, তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে, এমনকি সে যদি উটের পিঠ থেকে নামে।” (বুখারী)। আরেকটি হাদিসে আছে, “ওমরা হলো ছোট হজ্ব, যা জান্নাতের একটি দরজা।”

ওমরা করলে মুমিনের জন্য আল্লাহর নিকট একটি বিশেষ মর্যাদা লাভ হয়। এটি একটি সন্ন্যাসী ইবাদত, যা আল্লাহর নিকট কাছের করে তোলে। বিশেষ করে রমজান মাসে ওমরা করার ফজিলত আরও বেশি।

কী করবেন না ওমরা করার সময়?

  • ইহরামের সময় নাওয়াবিল মাখসুদ খুলবেন না।
  • কোনো অশ্লীল কাজ করবেন না।
  • অন্যদের পথ বাধা দিবেন না।
  • মেয়েদের জন্য পর্দা ভঙ্গ করবেন না।
  • ওমরা করার সময় কোনো অপবিত্র কাজ করবেন না, যেমন—চুল কাটা, নখ কাটা, গাছ কাটা ইত্যাদি।

Key Takeaways

  • ওমরা হলো মসজিদে হারামের আশেপাশে করা একটি সুন্নত ইবাদত।
  • ওমরা করতে হলে ইহরাম বাঁধতে হবে, তাওয়াফ, সাঈ ও হালাক করতে হবে।
  • ওমরা করলে গুনাহ ক্ষমা হয় এবং জান্নাতের দরজা হয়ে ওঠে।
  • ওমরা করার সময় বিভিন্ন দোয়া পাঠ করা উচিত।
  • ওমরা করার সময় শরিয়াতের নিয়ম মেনে চলতে হবে।

FAQ

ওমরা করতে হলে কতদিন আগে ইহরাম বাঁধতে হবে?

ওমরা করতে হলে মিক্বাতে ইহরাম বাঁধতে হয়। যে ব্যক্তি মক্কা থেকে দূরে থেকে আসবে, সে মিক্বাতে ইহরাম বাঁধবে। মক্কার বাসিন্দা মক্কা থেকেই ইহরাম বাঁধবে।

মেয়েদের জন্য ওমরা করার সময় কী করতে হবে?

মেয়েদের জন্য ওমরা করার সময় পর্দা ও শরীর ঢাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মাথা মুণ্ডন করার পরিবর্তে মাথার চুল খুলে মাসহ করা যথেষ্ট।

ওমরা করলে হজ্বের প্রয়োজন হয়?

না, ওমরা করলে হজ্বের প্রয়োজন হয় না। ওমরা সুন্নত, কিন্তু হজ্ব ফরজ। তবে যদি কেউ হজ্ব করে, তবে ওমরা করা সুন্নত।