মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা আসলে কি? কিভাবে সুরক্ষিত রাখবেন নিজেকে?

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা - obboymedia
মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা

মহামারী করোনা ভাইরাস সংক্রমণে যখন স্থবির গোটা পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবন, তখনই সংবাদমাধ্যমে খবর হয়ে এলো আরও একটি দুঃসংবাদ। নতুন আতঙ্কের নাম মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা বা মগজখেকো অ্যামিবা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবার সংক্রমণে মৃত্যুহার ৯৭ শতাংশ। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৮ শহরে ঘোষণা করা হয়েছে বিশেষ সর্তকর্তা।

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবার আক্রমণে সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে এক শিশু মারা গেলে বিষয়টি সামনে আসে। মস্তিষ্কের নিউরন ও স্নায়ুকোষগুলো অ্যামিবাগুলো ছিন্নভিন্ন করে ফেলায় শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি চিকিৎসকদের পক্ষে। শিশুটির পরিবার জানায়, সে হঠাৎ জ্ঞান হারালে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শিশুটির বাড়ির পানির নমুনা পরীক্ষা করা হলে মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা উপস্থিতি মেলে। ঘটনা জানাজানি হওয়ামাত্র হইচই শুরু হয় টেক্সাসজুড়ে। টেক্সাসের একটি ফোয়ারার পানির নুমনাতেও পাওয়া যায় মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা। দ্রুত জরুরি অবস্থা জারি করেন টেস্কাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট। সবাইকে নিষেধ করেন সরকারি সরবাহকৃত পানি খেতে।

পানিতে মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা - Obboy Media
পানিতে মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা – Obboy Media

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা আসলে কি?

মূলত অ্যামিবা, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের মতো ক্ষুদ্রাকৃতির ও এককোষী জীব। মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধণকারী এই বিশেষ অ্যামিবাটির নাম নাইগ্লেরিয়া ফোলেরি (Naegleria fowleri)। এটি ব্রেইন ইটিং অ্যামিবা (Brain-Eating Amoeba) নামে অধিক পরিচিত। সাধারণত এরা ব্যাকটেরিয়া খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু কোনোভাবে মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করলে ব্যাকটেরিয়া না পেয়ে সামনে যা পায় খাওয়া শুরু করে ফলে মস্তিষ্কের নিউরন ও স্নায়ুকোষ এর খাদ্যে পরিণত হয়।

নাইগ্লেরিয়া অ্যামিবার বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র ফোলেরি প্রজাতির অ্যামিবাগুলো মানুষের মস্তিষ্কে আক্রমণ করে। নাইগ্লেরিয়া ফোলেরি প্রজাতিরও বিভিন্ন উপপ্রজাতি আছে। তবে সবগুলোই সমান বিপদজনক। নাইগ্লেরিয়া ফোলেরি মাইক্রোস্কোপিক। জীবনের পর্যায় এবং পরিবেশের উপর নির্ভর করে আকারে ১৫ মাইক্রোমিটার থেকে ৮ মাইক্রোমিটার হয়ে থাকে এরা।

আরও পড়ুন,

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবার ভয়বহতা

যুক্তরাষ্ট্রে সতর্কতা জারির পর বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসলেও এটির অস্তিত্ব নতুন নয়। মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবার আক্রমণে ৯৭ শতাংশ মানুষেরই মৃত্যু হয়। তবে আশার বিষয় এটি খুব বিরল রোগ। আর করোনার মতো হাঁচি-কাশি থেকে ছড়ায় না। ১৯৬২ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ১৪৫ জন এই মগজখেকো অ্যামিবায় আক্রান্ত হয়েছে। দূর্ভাগ্য যে মাত্র ৪ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে আশঙ্কা গবেষকদের, তাদের বিশ্বের অনেক অঞ্চলে এটি থাকলেও আক্রান্ত রোগী সনাক্ত নাও হতে পারে।

bacteria Obboy Media | অব্যয় মিডিয়া

কোথায় থাকে মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা ? 

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা বা নাইগ্লেরিয়া ফোলেরি প্রজাতির অ্যামিবারা গরম পানিপ্রিয়। এটি ১১৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার পানিতে বেঁচে থাকতে পারে। মূলত এই অ্যামিবাগুলো সারা বিশ্বজুড়ে উষ্ণ জায়গাগুলোতে পাওয়া যায়। এটি যেকোনো উষ্ণ হ্রদ, পুকুর, এবং ধীরে ধীরে প্রবাহিত নদী, অপরিশোধিত সুইমিং পুল, অপরিশোধিত সরকারি পানি, দূষিত পানি বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি, অ্যাকুরিয়াম যেকোনো জায়গাতেই এটা পাওয়া যেতে পারে। এককথায় বলতে গেলে বিশ্বের সব অঞ্চলের অলবণাক্ত পানিতেই এরা থাকতে পারে।

৬০’র দশকে প্রথম আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে অস্ট্রেলিয়ায়। ১৯৬৫ সালে মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা সনাক্ত করা হয় অস্ট্রেলিয়াতেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এর আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে টেক্সাস, ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়। শুধু ফ্লোরিডাতেই ১৯৬২ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ৩৭জন আক্রান্ত হয়েছে।

আমাদের এশিয়া অঞ্চলে, পাকিস্তানে ১২ জন এই অ্যামিবার দ্বারা আক্রান্ত সনাক্ত হয়েছে। তবে মুসলিম বিশ্বের জন্য এই রোগ যেকোনো সময় মারাত্মক রূপ নেওয়ার সম্ভবনা আছে। ইসলাম ধর্মে ওজু করার বিধান অনু্যায়ী রয়েছে, নাকে পানি প্রবেশ করাতে হয়। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সিডিসি’র পরামর্শ, ওজুর পানি নাকে দেওয়ার পূর্বে ফুটিয়ে নিতে হবে অথবা ক্লোরিন দিয়ে জীবানুমুক্ত করে নিতে হবে। ভারত ও থাইল্যান্ডেও এই অ্যামিবার সংক্রমণ ঘটেছে। তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের কোনো খবর নেই।

আরও পড়ুন,

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা কীভাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে?

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা মস্তিষ্কে প্রবেশের প্রধান স্থান নাক। নাকের নার্ভের সাহায্যে এরা মস্তিষ্কে ঢোকে। মূলত ঘ্রাণ গ্রহণকারী নার্ভ (গন্ধ অনুভূতির সাথে সংযুক্ত স্নায়ু) মাধ্যমে মস্তিষ্কের সম্মুখ অংশে প্রবেশ করে এটি।

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা সংক্রমণের লক্ষণ

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা সংক্রমণের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে, মাথাব্যথা, জ্বর, ঘাড়ে টান লাগা, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, পরিবর্তিত মানসিক অবস্থা, খিঁচুনি এমনকি কোমা। এছাড়াও রয়েছে হ্যালুসিনেশন, ঝাপসা দৃষ্টি এবং স্বাদ অনুভূতি হ্রাস পাওয়া ।

bacteria Obboy Media 1 | অব্যয় মিডিয়া

নাইগ্লেরিয়া ফোলেরি নাকের মধ্যে প্রবেশের পর লক্ষণগুলি প্রদর্শিত হতে দুই থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। সাধারণত উপরোক্ত লক্ষণগুলি প্রকাশের তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে। লক্ষণ সূত্রপাত থেকে মৃত্যুর গড় সময় ৫.৩ দিন।

আরও পড়ুন,

মস্তিষ্ক খাওয়া অ্যামিবা সংক্রমণের চিকিৎসা ও সনাক্তকরণ পদ্ধতি

এটার সঠিক কোনো চিকিৎসা এখনও পর্যন্ত নেই। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় যদিও কিছু ওষুধ নাইগ্লেরিয়া ফোলেরি হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে তারপরও ওষুধগুলির রোগীর দেহে প্রয়োগের পর ব্যর্থ হয়েছে।

দূর্ভাগ্য হলেও সত্য মস্তিষ্ক খাওয়ার অ্যামিবা সংক্রমণ সনাক্তকরণে দ্রুত বা র‌্যাপিড কোনও পরীক্ষা নেই। তবে গবেষকরা এটি বিকাশের জন্য কাজ করছেন। এই ধরণের পরীক্ষাগুলি না আসা পর্যন্ত সনাক্ত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় নিতে পারে। ততদিনে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

কীভাবে মস্তিষ্ক খাওয়ার অ্যামিবা থেকে রক্ষা পাবেন ?

• গ্রীষ্মের শেষের দিকে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর পুকুর-নদী বা সুইমিং পুলে ডুব দিয়ে গোসল করা, সাঁতার কাটা এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
• সাঁতার কাটা, নৌকা চালানোর সময় নাকে ক্লিপ বা নোজ প্লাগ ব্যবহার করা। তবে সমুদ্রের পানিতে কোনো সমস্যা নেই।
• পানিতে নামলেও কাঁদা ঘোলা না করা। মূলত কাঁদার মধ্যে অ্যামিবাগুলো থাকে। লাফালাফি বা কোনো কারণে কাঁদা ঘোলা হলে অ্যামিবাগুলো পানিতে ভেসে ওঠে।
• ঠান্ডা-কাশির চিকিৎসার জন্য নাকে গড়ম পানির ভাব নিতে চাইলে ট্যাপের পানি না নিয়ে জীবাণুমুক্ত পানি ব্যবহার করা। প্রয়োজনে ১মাইক্রোনের থেকে ছোটো ফিল্টার ব্যবহার করা।
• ওযুর সময় নাকে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা৷ প্রয়োজনে পানি ফুটানোর পর ঠান্ডা করে ব্যবহার করতে হবে। জীবাণুমুক্ত করতে ক্লোরিন ব্যবহার করা যেতে পারে।

[কখনও ভেবেছেন কি আপনি কেনো রাস্তার বামপাশ ব্যবহার করন? জানতে পড়ুন,
আপনি কেনো রাস্তার বামদিক ব্যবহার করেন?আপনি কেনো রাস্তার বামদিক ব্যবহার করেন?

“ফেয়ার এন্ড লাভলী” থেকে হঠাৎ কেনো “গ্লো এন্ড লাভলী